After Consciousness

দ্যা ফল অফ ওয়ালস

বোধকরি আধুনিক বাংলা গানে সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হয়েছে যে শব্দটার সেটা হলো 'দেয়াল'।। "একটা লোনা দেয়াল, তাতে আঁশটে গন্ধ, তোমার আমার মাঝে, আমি স্পষ্ট বুঝি তুমি কান পেতে আছো, আর আমি তাই গান গেয়ে যাই" - সায়েম জয়ের লোনা দেয়াল গানটা শোনার সময় এই বোধটা হলো।। আবার পেটি নেভার গ্রো এর দেয়াল নামেই একটা গান আছে, "নীরস জীবনে অল্প আলো উঁকি দেয় দেয়ালের ফাঁক থেকে, শীতল আভাস পাওয়া যায় তোমার অস্তিত্বে"।। খুব শান্ত একটা গান।। বা সোনার বাংলা সার্কাসের অন্ধ দেয়াল গানেও এর ব্যবহার প্রবল।। দেয়াল শব্দটার সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা যায় প্রাচীরকে।। তাহসানের কে তুমি গানটায় লিখেছে, "ভুল করে একটাবার প্রাচীরটা ভেঙে দেখো, জমে আছে কতো কথা, ভুল করে বলে দিও"।। তবে দেয়াল শব্দটা ব্যবহার না করেই এর একটা উপস্থাপন হয়েছিলো থার্ড পার্সন সিঙ্গুলার নাম্বার মুভির বাহির বলে দূরে থাকুক, ভেতর বলে আসুক না গানটাতে।। দেয়াল বলতে আসলে যা বোঝানো হয় তার একটা ভালো উদাহরণ ওই গান।।

পিঙ্ক ফ্লয়েডের দ্যা ওয়াল নামে একটা অ্যালবাম আছে, ১৯৭৯ সালের।। কনসেপ্ট এলবাম বলতে যা বোঝায় তা ডিফাইনিং একটা অ্যালবাম।। আমার দৃষ্টিতে পিঙ্ক ফ্লয়েডের অলটাইম বেস্ট।। আইসোলেশন, অ্যালিয়েনেশন ফ্রম দ্য সোসাইটি আর একটা ব্যান্ডের তাদের অডিয়েন্সের সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়া থেকে এর জন্ম।। পিঙ্ক নামের একটা ইমাজিনারি ক্যারেক্টারের জীবনকে গান গুলো ফলো করে, জন্ম থেকে পোস্ট ওয়ার্ল্ড ওয়ারের ট্রমা, মায়ের সাথে দূরত্ব, সমাজ থেকে আলাদা হয়ে যাওয়া।। প্রতিটা পেইন সেখানে এনাদার ব্রিক ইন দ্য ওয়াল।। দেয়ালের উচ্চতা বাড়তেই থাকে পিঙ্কের।।

"Hey, you, out there beyond the wall

Breaking bottles in the hall

Can you help me?"

দ্য গ্রেইট বার্লিন ওয়ালের ফল হয় ১৯৮৯ সালে।। পোস্ট সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড ওয়ার যে কোল্ড ওয়ার শুরু হয়েছিল ইউরোপে তা জার্মানিকে দুটো ভাগে ভাগ করে রাখে।। ইস্ট জার্মানির কমিউনিস্ট ব্লক সোভিয়েত দ্বারা নিয়ন্ত্রিত আর ওয়েস্ট জার্মানির ক্যাপিটালিস্ট ব্লক অ্যামেরিকা, ব্রিটেন দ্বারা।। ১৯৬১ সালে জার্মান ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক(ইস্টার্ন ব্লকের-মজার বিষয় হলো নামে ডেমোক্রেটিক হলেও এদের ম্যানিফেস্টো ছিলো কমিউনিস্ট) ওয়াল এটা বানায় প্রায় ওভার দ্য নাইট।। কারণ ছিলো ওয়েস্টের ফ্যাসিস্ট আইডিওলজিকে ট্যাকল দেওয়া, তবে আরো বড় কারণ ছিলো ইস্ট জার্মানির মানুষজনকে ওয়েস্টে মাইগ্রেশানে থেকে থামানো।। যেহেতু ওয়েস্ট জার্মানি তখন ক্যাপিটালিজন আর ফ্রী মার্কেটের আন্ডারে তাই উহাই অনেকের গন্তব্য হয়ে দাড়িয়েছিল।। ধীরে ধীরে ইস্টার্ন ব্লকে তৈরি হওয়া হতাশা আর অপ্রেশনের কারণে ৮৯' সালে ফল হয় দ্য গ্রেট বার্লিন ওয়ালের।। সোভিয়েতও ফল করে এর দু'বছরের মাথায়।। ফল অফ বার্লিন ওয়ালই ছিলো কোল্ড ওয়ারের সমাপ্তি।।

ফিলিস্তিনের ওয়েস্ট ব্যাংকের গ্রীণ লাইন ধরে ৭০৮ কি.মি লম্বা একটা দেয়াল তুলে রেখেছে দখলদারি ইসরায়েল।। দ্য ওয়াল অফ রেজিসটেন্স বলি আমরা একে।। এই দেয়ালের সাথে আমার প্রথম পরিচয় আরো দশ-বারো বছর আগে ওয়ার্ল্ড ওয়ার জে নামের এক বক্স অফিস হিট হলিউড মুভির মধ্যে দিয়ে।। ন্যারেটিভ আর কলোনাইজেশন নিয়ে ধারণা না থাকায় তখন বুঝতে পারিনি তবে সেখানে আদারিং এবং ডিহিউম্যানাইজেশন করা কিভাবে হয়েছিল ফিলিস্তিনিদের তা এখন বুঝি।। দখলদারি ইসরায়েলের ভাষায় এটা হলো সেপারেশন ব্যারিয়ার, ছবিতে জম্বি হামলাটা আসে দেয়ালের ওপারের ওয়েস্ট ব্যাংক থেকে এপারের সেটেলার ইসরাইলি সভ্যতার উপরে।। তবে ন্যারেটিভের বাইরে এই দেয়ালকে আমরা রিড করতে পারি বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেজিসট্যান্স গ্রাফিতির ওয়াল হিসেবে।। সেখানে লাইলা খালিদ(তেলআবিব থেকে যে প্লেন হাইজ্যাক করে), আহেদ তামিমির ম্যুরাল থেকে আছে মাহমুদ দারবিশের ফিলিস্তিনের ডিক্লেয়ারেশন অফ ইনডিপেনডেন্স।। ৮ মিটার লম্বা দেয়ালটাকে বার্লিন ওয়াল কিংবা পিঙ্ক ফ্লয়েডের ওয়াল বা দুনিয়ার কোনো দেয়াল হয়তো ধারণ করতে পারবেনা।। "রেজিসটেন্স ইজ এক্সিজটেন্স" এই কথাটাই একো হয় গ্রাফিতি জুড়ে।।

গতবছর জুলাইয়ের আগে আমি যতোবারই ঢাকায় গিয়েছি আমার চোখে পড়তো দেয়ালে দেয়ালে গ্রাফিতি, চট্টগ্রামে গ্রাফিতি ছিলো না।। এর ব্যাখ্যা আমি বন্ধুদের দিতাম চট্টগ্রাম পলিটিকাল এনটিটি না এমনটা বলে।। হ্যা পার্টিজ্যান পলিটিক্স ছিলো, তবে ছিলো না নিজেরা ব্যক্তিগত ভাবে পলিটিক্যাল হয়ে ওঠা, সামগ্রিক ভাবে পলিটিক্যাল হয়ে ওঠা।৷ জুলাই পরবর্তী দেয়াল গুলো একটা নীরব সময়ের সাক্ষী সর্বদাই।।

দেয়াল দিয়ে আসলে দূরত্বের বিভেদও বোঝায় না, দেয়াল দিয়ে বোঝায় যা পাশেই আছে, শুধু একটা বাঁধা রয়ে গেছে মাঝখানে।।

দেয়াল দিয়ে বোঝায় একটা অকুপাইড প্যালেস্টাইন, দেয়াল দিয়ে বোঝায় একটা দূরে সরে যাওয়া মানুষকে, দেয়াল দিয়ে বোঝায় গতকালের তান্ডব বয়ে বেড়ানো বর্তমানকে।। দেয়ালের মধ্যে আমি ছোটোবেলায় নাম লিখে রাখতাম নিজের অস্তিত্বের জানান দিতে হয়তো।৷ বার্লিন ওয়াল হোক, লোনা দেয়াল হোক কিংবা দ্য ওয়াল অফ রেজিসটেন্স, সবকিছুই আসলে শুধু একটা জিনিসকে নির্দেশ করে, আমাদের মাঝের দূরত্বকে, মানুষের দূরে সরে যাওয়াকে৷। একটা অকুপাইড ফিলিস্তিনের মুক্তি দরকার, দরকার মানুষের মধ্যেকার দূরত্বের মুক্তিটাও।।

-দ্য ফল অফ ওয়ালস।।